অপহৃত হওয়ার তিন রাত দুই দিন পর ঘরে ফিরলো তরুণী।

Uncategorized
অপহৃত হওয়ার তিন রাত দুই দিন পর ঘরে ফিরলো তরুণী।
সে সাবলীল- “আম্মা, সাবান দাও তো দেখি, ভালো কইরে গা ধুই। অরা তিনজনে আমারে ধর্ষণ করছে। কীসব কাণ্ড!”
মেয়ে ফিরে এসেছে, পরিবার চিন্তামুক্ত হলো। কিন্তু, বীভৎস চিন্তায় পড়ে গেলো জাতি। সবাই হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে আসতে আরম্ভ করলো ও-বাড়ি লক্ষ্য করে। বাড়ির কর্তা, উৎসুক অতিথিদের সুবিধার্থে উঠানে প্যান্ডেল টাঙিয়ে দিলেন।
মুক্তমনা সংবাদমাধ্যম মাইক এগিয়ে দিলো- “ধর্ষক তিনটা নিশ্চয়ই ধর্মমনা ছিল বইন?”
তরুণী সাবলীল- “হ। ধর্ষণকালে একজন বলতেছিল ‘আল্লাহু আকবর’, একজন বলতেছিল ‘হরে রাম’, একজন বলতেছিল ‘ফাদার জেসাস’।”
মুক্তমনা নাচতে-নাচতে দৌড়ান দিলো, জায়গা খালি হলো। এলো ধর্মমনা সংবাদমাধ্যম- “ধর্ষক তিনটা নিশ্চয়ই নাস্তেক ছিল বইন?”
তরুণী সাবলীল- “হ। ধর্ষণকালে একজন বলতেছিল ‘মার্ক্স মার্ক্স’, একজন বলতেছিল ‘মাও মাও’, একজন বলতেছিল ‘ফিদেল ফিদেল’।
ধর্মমনা বগল বাজাতে-বাজাতে দৌড় মারলো, এলো ভৌগোলিক সংবাদমাধ্যম- “ধর্ষক তিনটা নিশ্চয়ই শত্রুদেশের এজেন্ট আছিল বইন?”
তরুণী সাবলীল- “হ। ধর্ষণকালে একজন বলতেছিল ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, একজন বলতেছিল ‘বন্দে মাতরম’, একজন বলতেছিল ‘লং লিভ আমেরিকা’।”
ভূগোলবিদ পান চিবাতে-চিবাতে লাপাত্তা। এলো রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম- “ধর্ষক তিনটা নিশ্চয়ই পলিটিক্যাল লম্পট ছিলো বইন?”
তরুণী সাবলীল- “হ। ধর্ষণকালে একজন বলতেছিল ‘জয় বাংলা’, একজন বলতেছিল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, একজন বলতেছিল ‘নারায়ে তকবির’।”
রাজনীতিজ্ঞ আনন্দে আত্মহারা ও উধাও, এলো সমাজপতি- “তর লাজশরম নাই বেডি? হইছস ধর্ষণের শিকার, লুকায়-ঝুঁকায় থাকবি, কিম্বা দড়ির মাথায় ঝুইলা মরবি, কিম্বা আমাগোর পায় ধইরা ঝুইল্যা থাকবি ‘বিচার করেন গ মুরুব্বিরা, দয়া করেন গ বাপজানেরা’। তা না, গলার রগ ফুলায়া মাইকিং করস ‘ধশ্শনকালে, ধশ্শনকালে!’… তুই বেইশ্যা?”
তরুণী সাবলীল- “হ। আমি বেইশ্যা।”
সমাজপতিবৃন্দ সালিশ ডাকলো। পবিত্র সমাজে বেইশ্যার জাগা নাই, এরে দেশছাড়া কর্। আবার হুড়মুড়িয়ে ছুটে এলো জাতি, হাতে মাইক।
“আপনি নিজেকে গণিকা পরিচয় দিচ্ছেন! কোনো প্রতিবাদ করছেন না! এ কেমন ভূমিকা!”
তরুণী সাবলীল- “কিসের প্রতিবাদ?”
মাইক- “এইযে, ঘরছাড়া করার?”
তরুণী সাবলীল- “এরা আমারে ঘরছাড়া করবে না। দুনিয়া বাংলা সিনেমা না। এরা বড়জোর কুনোদিন আমার বিয়া হইতে দিবে না। এট্টুক।”
মুক্তমনা, ধর্মমনা, ভূগোলমনা, রাজনীতিমনা, সব মনা মাইকগুলো সমস্বরে আর্তনাদ করে উঠলো- “তাইলে! তাইলে? তাইলে, আপনের উপায়?”
তরুণী সাবলীল- “কন কী? অই তিনজনাই পুরুষ আছিল, অতএব আমার চায়া গায়ে জোর আছিল বেশি, জবরদস্তিতে যৌনতা করছে। হইছেডা কী? আমার গা’র বাইরে অদের থুথু, বীর্য এইসব লাইগা আছিল, ধুইয়া ফেলছি; গা’র ভিত্রে বীর্য ঢুকায়া দিছিল, পেশাবের লগে বাইর কইরা দিছি; আর কিছু থাইকা থাকলে, ডাক্তারের সাহাইয্যে বাইর কইরে ফেইলব। আমার ত সমইস্যা দেখি না। সমইস্যা সমাজের, আর সমইস্যা আমারে বিয়া করতে না-চাওয়া পুরুষদের। যে-পুরুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে রাস্তায় মিছিল কইরে, সারাদিন এইখানে-সেইখানে লেখালেখি কইরে, দেশ উল্টাই ফেলায়, তারা যদি আমারে বিয়া করতে না-চায়, তয় তারা ভণ্ড। বিয়া না-হইলে হইব না! প্রবলেম কী? তয়, অপমানিত হইছি। তিন-তিনটা পুরুষের সামনে উলঙ্গ হওয়ার শিক্ষা আমার পরিবার দেয় নাই, আমার পড়াশুনায় দেয় নাই, আমার ধর্মশাস্ত্রয় দেয় নাই, আমার রুচিতেও দেয় নাই। অরা ঠিক সেই মর্যাদায় আঘাত করছে। অপমানডা ভোলা হইব না, এই যা। অন্য কুনো নাকিকান্দন নাই। উলঙ্গ কিন্তু তারাও হইছিল, এইডা ভুইলে যাইতাছেন। অতএব, অপমান তাদেরও লাগছে কিনা, এই প্রশ্নটাই গুরুত্বপূর্ণ। মজার বিষয়, আপনেরা জানতে চান অরা হিন্দু না মুসলমান, বিএনপি না আওয়ামীলীগ, চাইনিজ না ফরাসি, আমার বিয়া নিয়া আমি বিলাপ করতেছি কিনা, অথচ অই প্রশ্নের ধারকাছ দিয়াও কিন্তু আপনেরা যান নাই। আমার ত ক্ষীণ সন্দেহ, নারীর আহাজারি দেখার জন্যই জাতি একপায় খাড়ায়া আছে! সইত্য নাকি? সেই দিন গেছেগা। যান, আবার ঘুমাইতে যান।”
এ-আগুন জন্মেছে কোথাও?
Salah Uddin Ahmed Jewel
#অনল, ২২.১১.২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *