আমাদের একজন সিনিয়র কলিগ কিছুদিন আগে রিটায়ার করেছেন। উনি তাঁর বিদায় ভাষণের এক জায়গায় একটা কথা বললেন যা বেশ নাড়া দিল।

Uncategorized

আমাদের একজন সিনিয়র কলিগ কিছুদিন আগে রিটায়ার করেছেন। উনি তাঁর বিদায় ভাষণের এক জায়গায় একটা কথা বললেন যা বেশ নাড়া দিল। আমি মোটামুটি একটা নোট করেছি, সেখান থেকে লিখছি।

===

তোমাদের মধ্যে অনেকেই সম্প্রতি মধ্য-ত্রিশ পার করেছ। তোমরা একটু চিন্তা করলেই হয়ত গত ত্রিশ বছরের একটা চিত্র মাথার মধ্যে দেখতে পাও। কতকিছু পরিবর্তন হল তাই না? বাড়ির আসবাবপত্র বদলে গেল। বাবা-মা বুড়িয়ে গেল, কেউ কেউ চলে গেল। তুমিও সেই ছোট্ট খোকা-খুকী থেকে এখন বেশ পরিণত একজন মানুষ, জীবন অনেক বেশি বোঝ। অনেকেই সংসার শুরু করেছ, বাচ্চা-কাচ্চা আছে। তবে, এই যে পেছনের ত্রিশটা বছর সেটা কিন্তু তোমার কাছে একটা বেশ ঘটনাবহুল ভ্রমণের মত। যেন ঠিক ট্রেনের এক কামরাতে বসে জানালা দিয়ে বিশ্ব দেখছ, আর স্টপে স্টপে সেটা বদলে যাচ্ছে। নতুন নতুন চিত্র সামনে আসছে। ট্রেনের কামরাতে বসে থাকা লোকজন পরিবর্তন হচ্ছে। ট্রেনটা থামছে না কিছুতেই, ছুটেই চলছে। যারা নেমে যাচ্ছে, তুমি চেষ্টা করেও তাদের থামাতে পারছ না। তুমিও এই রাইডটা বেশ উপভোগ করছ। কামরাতে দৈনিক ভাল ভাল খাবার আসছে। তুমিও ট্রেনের জানালা থেকে মুখ ঘুরিয়ে সেইসব খাবার আর খবরের কাগজ (বা তোমরা যাকে আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া বল) সেটা দেখে নিচ্ছ।

আমি বলব, এই স্টপে একটু থাম, একটু দম নাও, ট্রেনের পরের দৌড়টা শুরু করার আগে। কারণ, যতখানি তুমি পার হয়ে এসেছ, স্বাভাবিক জীবন গেলে হয়ত আর ঠিক ততখানিই তোমার ভ্রমণ বাকি আছে। তবে ভ্রমণের এই পথটুকুতে একটু ভিন্নতা থাকবে।

এবার দেখবে তুমি ধীরে ধীরে জানালা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ছ। জানালার বাইরের দৃশ্যের চেয়ে পাশে বসা মানুষটাকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হবে। খাবার যা আসছে তার চেয়ে যে খাবারটা নিয়ে আসছে তাকে তোমার বেশি দরকারি মনে হবে। ট্রেন থেকে কেউ নেমে গেলে তুমি আগের থেকে অনেক বেশি কষ্ট পাবে। তার থেকে বেশি কষ্ট পাবে যখন বুঝবে তোমার নাক ডাকার কারণে তোমার কামরার বাকি লোকদের কষ্ট হচ্ছে। তুমি সবার সাথে আড্ডা জমাতে চাইবে। বিগত ত্রিশ বছরে তুমি ট্রেনের জানালা দিয়ে যা যা দেখেছ তার গল্প বলতে চাইবে। কিন্তু নতুনরা তোমার গল্প শোনার চেয়ে তাদের জানালা দিয়ে নতুন যা যা দেখা যাচ্ছে সেটা দেখতেই বেশি পছন্দ করবে। তুমিও জানালার বাইরে মাঝে মাঝে তাকাবে। কিন্তু তোমার দৃষ্টিশক্তি কমে যাবার জন্যই হোক, অথবা নতুন জায়গার বৈশিষ্ট্যের কারণেই হোক, তুমি ঠিক বুঝবে না বাইরে কী হচ্ছে। একসময় তুমি ট্রেনের বাইরে তাকানো একেবারে বন্ধ করে দেবে। বিগত ত্রিশ বছরে যা যা দেখেছ, সেটাই তোমার চোখের মূল অর্জন হয়ে থাকবে। চোখ বন্ধ করে সেগুলোই বারবার দেখবে। চোখ খুলে যা দেখ তার থেকে চোখ বন্ধ করলে যা যা দেখতে পাও সেগুলোকে বেশি আপন বলে মনে হবে। একসময় তুমি বুঝবে যে, চোখ চিরতরে বন্ধ করে ফেলার সময় হয়েছে, এবং আমি নিশ্চিত তোমরা সেইসময়টাতে আনন্দিত মনে থাকবে।

না, আমি বলছি না যে তোমাদের যা যা দেখার বা করার তা শেষ। অবশ্যই এরপরের বয়সটাতে মানুষজন দারুণ কিছু কাজ করে। এবং তোমরা প্রত্যেকেই তাই করবে। তবে সেসব কাজগুলো তোমার বিগত ত্রিশ বছরের যে জীবন সেটার ওপরেই অনেকখানি দাঁড়িয়ে থাকবে। আমি তাই বলছি এখনও যতটুকু সময় আছে সেটা কাজে লাগাও। নতুন কোন দেশ ঘোর। লোকজন যেসব পপুলার জায়গায় গিয়ে ছবি তোলে সেগুলো না, যেসব জায়গা তুমি কখনও কল্পনা করতে পার না, সেসব জায়াগায় যাবার চেষ্টা কর – মোঙ্গলিয়া যাও, তিব্বতে যাও, মাদাগাস্কারে যাও। ওখানকার ট্যুরিস্ট বা সুন্দর জায়গাগুলোতে যেও না। গরীব আন্টির দোকানে গিয়ে এক বেলা খাও আর তাকে তাঁর জীবনের গল্প বলতে অনুরোধ কর। পাহাড়ে ওঠ, স্কুবা ডাইভ দাও, বৌদ্ধ মুনীদের সাথে এক সপ্তাহ থাক। একটা সিনেমা বানাও যেখানে তুমিই নায়ক বা নায়িকা। একটা বই লেখ – ফিকশন টাইপ। একটা গাছ লাগাও। একটা ব্যবসা দাঁড় করাও। নতুন মানুষের সাথে মেশ। নতুন ধরণের জামা পর। নতুন একটা ভাষা শেখ। তোমার শত্রু যে আছে, হঠাৎ একদিন অনেক গিফট নিয়ে তাঁর কাছে যাও, এবং নিজে ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক ভাল করে ফেল। আমি বাজি ধরলাম, তুমি পস্তাবে না। নতুন আইটেম রান্না কর, তোমার প্রিয়তমের জন্য একটা সোয়েটার বুনো, একটা কবিতা লেখ, একটা ছবি আঁক। সে যা যা বলল এসব দেখে, সব নোট করে রাখ তোমার ডাইরিতে।

… এইসব করবে কেন জান? যখন চোখের সামনে দেখা পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসবে, তখন চোখ বন্ধ করে যেন এই সময়গুলোতে ফিরে যেয়ে দিব্যি একটা বার্ধক্য কাটিয়ে দিতে পার। সেইসময়ে তোমার এই বুড়ো বন্ধুর কথা মনে হলে একটা ধন্যবাদ দিও। আমি হয়ত স্বর্গ (নাকি নরক? হাহা) থেকে তোমাকে দেখে হিংসে করব।

(সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *