কৃষ্ণ, মুহম্মদ ও তাঁদের নিষ্ঠুর যুদ্ধ : সুষুপ্ত পাঠক

Uncategorized

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর কৌরব বংশে বিধবাতে ভরে উঠেছিলো। হাজার হাজার পিতৃহীন শিশু ও স্বামীহীন নারীর হাহাকার আর কান্নায় ৫ হাজার বছর আগের প্রাচীন ভারতের আকাশ ভারি হয়ে উঠেছিলো। কুরু বংশের জ্যাঠতুতো আর কাকাতুতো ভাইদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই এত মৃত্যু ডেকে এনেছিলো তবু ইতিহাস সেই যুদ্ধকে মহান বলছে! কেন? কারণ পান্ডবরা জিতে ছিলো। কৌরব বংশের শত শত বিধবাদের দীর্ঘশ্বাসের জন্য দায়ী যে শ্রীকৃষ্ণ তিনি জিতে ছিলেন বলেই তিনি নায়ক। দস্তয়ভস্কি তার ‘ক্রাইম এন্ড পানিসমেন্ট’ উপন্যাসে নায়ক রাসকলনিকভকে দিয়ে একজন ঘৃণ্য সুদখোর বুড়িকে হত্যা করান। এই হত্যা ডাকাতির উদ্দেশ্যে ছিলো না। ছিলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও একটি আদর্শের নিরিখে। কিন্তু খুন করে রাসকলনিকভ অনুশোচনায় ভুগতে থাকে। সে আইনের হাতে ধরা দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে সে যুক্তি দেয়, সে কোন অন্যায় করেনি। নেপোলিয়ান বা চেঙ্গিস খানরা যা করেছে সে ঠিক তাই করেছে। নেপোলিয়ানরা বিজয়ী হয়েছে তাই তারা খুনি নয়। কিন্তু রাসকলনিকভ খুনি কারণ সে হেরে গেছে। দস্তয়ভস্কি রুশ বিপ্লব দেখে যেতে পারেননি। লেলিন হেরে গেলে সে হত খুনি। শত শত নারীকে বিধবা করার জন্য দায়ী হত। শত শত শিশুর পিতৃ হত্যাকারী হতো। রাশিয়ার ইয়েকেতারিনবার্গে একটি গির্জায় ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে জার দ্বিতীয় নিকোলাস, তার স্ত্রী, সন্তান ও দাস দাসীদেরকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে কমিউনিস্টরা। আমি জার নিকোলাসের কন্যাদের ছবি দেখেছি। নিষ্পাপ ফুলের মত দেখতে জারের কিশোরী কন্যাকে যে হত্যা করেছিলো সে একটা আর্দশের জন্যই অতখানি নিষ্ঠুর হতে পেরেছিলো!

আমরা আরবের দিকে একটু তাকাই। পুরো মক্কার অলিতে গলিতে বদর যুদ্ধের পর সন্তান হারা মায়ের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো। পিতৃহীন শিশুদের ভবিষৎ আর বিধবাদের অনিশ্চিত ভারনপোষণ নিয়ে মুহাম্মদের আদর্শ কিন্তু বিন্দু পরিমাণ ভাবেনি। মুহাম্মদ আরবে বিজয়ী হয়েছিলো তাই তার আদর্শকে অর্থময় করে তোলার জন্য পন্ডিতরা নিয়োজিত হয়েছিলো। সেই পন্ডিতদের তালিকায় বিধর্মীরাও সামিল হয়েছিলো। কিন্তু মুহাম্মদ হেরে গেলে তাকে খুনি ছাড়া আর কিছুই বলা হত না। পৃথিবীর মহান সব বীর, শাসক, যোদ্ধা আসলে একেকজন রক্তলোলুপ খুনি মাত্র। তাদের আদর্শগুলো বড়জোর কয়েক দশকের জন্য উপযোগী হতে পারে। কখনো কখনো সেখানে যৌক্তিক কোন কারণই থাকে না। মুহাম্মদের যুদ্ধগুলো থেকে কারবালা কোথাও মহান কোন কারণ ছিলো না মানুষ হত্যার পিছনে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বেলাতেও এটা সত্য। শকুনি মামা যেমন কুমন্ত্রণা দিতে কৌরবদের, একইভাবে শ্রীকৃষ্ণ পঞ্চ পান্ডবদের কুমন্ত্রণা দিয়েছিলো যুদ্ধের জন্য। দেশীয় রাজাদের উশকে দিয়েছিলো শ্রীকৃষ্ণ যাতে তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এতবড় যুদ্ধই হত না যদি স্থানীয় রাজারা যুদ্ধে না জড়াত। এর পিছনে কৃষ্ণ ইন্দন দিয়েছিলো। ফলশ্রুতিতে কৌরবরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো পুরোপুরি। এই সুযোগটা নিয়েছিলো আর্যরা। অনেকেই জানে না পঞ্চ পান্ডব ও কৌরবরা কেউ আর্য বা ব্রাহ্মণ ছিলো না। তারা ছিলো অনার্য ক্ষত্রিয়। এই পুরো কাহিনী আর্য বিজয়ের পর পান্ডব ও কৌরবদের ব্রাহ্মণ করে তোলে আর্য কবিরা। স্বজন হত্যার অনুশোচনায় অল্পকালের মধ্যে পঞ্চ পান্ডব রাজ্যপাট ছেড়ে চলে যাওয়া এবং আর্য নেতা ইন্দ্র অংশুমতি নদীর তীরে অনার্য ক্ষত্রিয় রাজা কৃষ্ণকে পরাজিত ও হত্যা করে। অর্জুনকে যে আদর্শ শুনিয়ে মহাযুদ্ধ বাধিয়েছিলো কৃষ্ণ তা যে কত ঠুংক ছিলো তার অংশুমতি নদীর তীরে কৃষ্ণের মৃত্যু প্রমাণিত হয়েছিলো। কুরু বংশ যে অনার্য ছিলো এবং কথিত ভগবান ইন্দ্রের হাতে যে শ্রীকৃষ্ণ মারা গেছিয়েছিলেন সেটা ঋকবেদেই পাওয়া যায়। বেদের কোথায় সেটা বলা আছে আপাতত বলতে পারছি না। আগ্রহীরা নিজেরা খুঁজে আমাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেন।

ওদিকে মুহাম্মদ তার পরিবার প্রতিটি সদস্যের অপঘাতে মৃত্যুর জন্যই দায়ী কারণ তার আদর্শই এই নরহত্যা ডেকে এনেছিলো। মক্কায় প্রবেশ করতে করতে মুহাম্মদ বলেছিলো, সত্য এসে গেছে মিথ্যা দূরীভূত হয়েছে…। কি সে সত্য যার জন্য কন্যা ফাতেমাকে অপঘাতে মরতে হয়? ওমর আলী ওসমানকে যারা হত্যা করেছে তারা সকলেই ছিলো মুহাম্মদের কথিত সেই সত্যের অনুসারী। সেই সত্যের অনুসারীরাই মুহাম্মদের নাতির কাটা মস্তক নিয়ে ফুটবল খেলেছিলো! ইতিহাস কিন্তু কোন মন্তব্য করে না। ইতিহাস থেকে বুঝে নিতে হয়। কোন মহৎ আদর্শের জন্যও হত্যা কাম্য নয়। কোন মহান দর্শনের জন্যও একটি হত্যাও কাম্য নয়। হত্যার কোন জাস্টিফাই হয় না। এটাই আমার ইতিহাসের শিক্ষা। অবশ্য প্রতিরোধ যুদ্ধ করে যাদের শত্রুদের মোকাবেলা করতে হয় তাদের কথা এখানে আসছে না। নিজেকে রক্ষা করতে হত্যা প্রতিরোধকে এখানে গুলিয়ে ফেলাটা হবে কুর্তক। 

#সুষুপ্ত_পাঠক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *