ছোটগল্প : কালোসালু [] কালের লিখন

Uncategorized

ছেলেটির গুহ্যদ্বার ফুলে গেছে, ব্লিডিং হয়েছে। ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিলেন। ছেলেটার মা উৎকণ্ঠার সাথে জানতে চাইলেন— ডাক্তার সাব আমার পোলার এইরাম অবস্থা কেন হইছে?

ডাক্তার বললেন— আপনার ছেলে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। জোর করে ওর পায়ুপথে কেউ সঙ্গম করেছে।

রেহানা ধানের চাতালে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। ১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছে। বছর না ঘুরতেই পেটে বাচ্চা চলে এলো। এই ধারা পরপর চলতেই থাকলো। এখন তার বয়স ২৩। এরমধ্যেই সে তিনছেলে, দুইমেয়ের জননী।

অভাবের সংসারে বছর বছর মুখ বেড়েছে, আয় বাড়েনি। তার স্বামী গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিন। ৫ বার আজান দেওয়া, মসজিদের জন্য গ্রামের মানুষের কাছ থেকে চাল-ধান তোলা, ইমাম সাহেবের সাথে বিভিন্ন জায়গায় দাওয়াতে যাওয়া; এসবই তার কাজ।

রেহানা অনেকবার জন্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলতে চাইলেও তার মুয়াজ্জিন স্বামী সেসব আমলে নেয়নি, বলেছে— মুখ দিবে যে; রিজিকের মালিকও সে; সব ব্যবস্থা তার। এরফলে বছর বছর বাচ্চা বেড়েছে, রিজিকের ব্যবস্থা সেভাবে আর হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে বড়োছেলেটাকে পাশের গ্রামের এতিমখানার মাদ্রাসায় দিতে হয়েছে। সেখানে তিনবেলা খাবার আর পড়ালেখা ফ্রি!

এই মাদ্রাসার নাম ফুরকানিয়া এতিমখানা মাদ্রাসা। গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি মিহির হাওলাদার এর প্রতিষ্ঠাতা। তার অঢেল সম্পত্তি। পরকালে বেহেশতের আশা আর এতিম ও দুঃস্থমানুষের সন্তানরা যাতে দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে তাই এই মাদ্রাসা করেছেন। কিছু অনুদান পেলেও অধিকাংশ ব্যয়ভার তিনি নিজেই বহন করেন।

তিনএকর জায়গায় ওপর সারি দেওয়া লম্বা লম্বা টিনের ঘর করে দিয়েছেন। এখানে বাচ্চাদের থাকার ব্যবস্থা আছে, খাবার জন্য আলাদা ঘর আছে। মাদ্রাসার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকও আছে। মিহির হাওলাদারের দুইছেলে একমেয়ে। তারা সবাই ঢাকায় পড়ালেখা করে।

মাদ্রাসার অধিকাংশ শিক্ষক বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে ক্লাস নেন। কয়েকজন শিক্ষক মাদ্রাসাতেই থাকেন। তারা শিক্ষকতার পাশাপাশি ছাত্রদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন। ঠিকমতো নামাজ পড়া, সুন্নত অনুযায়ী চলাফেরা, সপ্তাহে একদিন বিভিন্ন গ্রামে মাদ্রাসার বাচ্চাদের নিয়ে কালেকশনে বের হওয়া; এসব কাজ করেন তারা।

মাদ্রাসার প্রধান একজন নামী হুজুর। পুরো জেলার মানুষ তাকে একনামে চেনে। তিনি একজন সুখ্যাত বক্তা। ওয়াজমাহফিলে তার বেশ কদর। তিনি অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেন। আশেপাশের কয়েকগ্রামে তাই এই এতিমখানা মাদ্রাসার বেশ সুনাম। এতিম ও দুঃস্থশিশু ছাড়াও আজকাল অনেক স্বচ্ছল পরিবারের শিশুরাও এই মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে।

মাসে একদিন মাদ্রাসার শিক্ষকদের সাথে মিটিং করেন মিহির হাওলাদার। আজকের মাসিক মিটিংয়ে তিনি বললেন—

— বড়োহুজুর, আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পরে এই মাদ্রাসার সুনাম বেড়ে গেছে। দূরদুরান্ত থেকে মানুষজন তাদের সন্তান নিয়ে হাজির হচ্ছে। আল্লাহপাকের অসীমকৃপা আর আপনার ভালোবাসা।

— আলহামদুলিল্লাহ। হাওলাদার সাহেব, সবই আল্লাহপাকের হুকুম। আপনার সহযোগিতা আর উদার মানসিকতা না পেলে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হতো না। মহান আল্লাহ আপনাকে কবুল করুন।

শিক্ষকদের মধ্যে থেকে একজন হুজুর বললেন— ছাত্রদের জন্য আরও দুটো টয়লেট নির্মাণ জরুরি। আর ওযুখানাটা আরও একটু বড় করা দরকার।

মিহির সাহেব বললেন— ঠিক আছে হুজুর। হয়ে যাবে কাজ দুটো। আমার একটা প্রস্তাবনা ছিলো বড় হুজুরের কাছে।

— বলুন হাওলাদার সাহেব।

— এখানে তো সব ছেলেরা পড়ালেখা করে। আমি দেখেছি গ্রামের অনেক মেয়েই পড়ালেখার সুযোগ পায় না। তাদের জন্য কি আমরা আমাদের মাদ্রাসায় শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি না?

— অবশ্যই পারি। আল্লাহপাকের কাছে নারী-পুরুষ সবাই সমান।

দুইবছরে মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম আর পরিধি আরও বেড়ে গেলো। ছাত্রদের পাশাপাশি এখন এতিমখানা মাদ্রাসায় ছাত্রীরাও পড়ালেখা করে। তাদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বড়হুজুর কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, বিজ্ঞান, কারিগরি ও সামাজিক শিক্ষার ওপরেও জোর দিয়েছেন।

একদিন বড়োহুজুরের কাছে একজন শিক্ষক অভিযোগ নিয়ে এলেন— আব্দুল্লাহ স্যার তো বাচ্চাদের সাথে খারাপ কাজ করে। দুইজন ছেলে এই মাসে অসুস্থ্য হয়ে ডাক্তারের কাছে গেছে। তাদের দুজনেরই পায়ুপথ ফেটে গেছে। একজন ছাত্রীও হুজুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তিনি নাকি ক্লাসশেষে তাকে আটকে রেখে গল্প করার চেষ্টা করেন, গায়েও হাত দিয়েছেন।

বড়োহুজুর অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষকদের এসব ব্যাপার আগে থেকেই জানেন। অভিযুক্ত শিক্ষককে তিনি ডাকলেন। শিক্ষক তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করলেন।

মাদ্রাসায় মেয়েদের বোরকা পরা বাধ্যতামূলক। একইরকম কালোবোরকা পরিহিত মেয়েদের অনেকসময় কিছুতেই আলাদা করা যায় না। নাম না বললে আলাদা করে শিক্ষকরাও তাদের চিনতে পারেন না।

— তোর বাপ তো একটা লুচ্চা। আমার গায়ে হাত দিয়েছে।
রাবেয়ার কথা শুনে শম্পা বেশ আহত হয়ে চুপ করে যায়।

শম্পা আব্দুল্লাহ হুজুরের মেয়ে। সে এই মাদ্রাসাতেই পড়ে। তার বাবার এইসব অভ্যাসের কথা সে লোকমুখে শুনেছে। এর আগের মাদ্রাসা থেকে তার বাবার চাকরি চলে গেছে এইসব কাজের জন্যই।

একদিন ক্লাসশেষে হুজুর বললেন— রাবেয়া, তুমি থাকো। তোমাকে আজকে গণিত সিলেবাস দেখিয়ে দেবো। ক্লাসের মেয়েরা সবাই বেরিয়ে গেলো, রাবেয়া ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।

হুজুর বললেন কাছে আসো। দূর থেকে কি পড়ালেখা হয়? এখন তো কেউ নাই, বোরকা খুলে ফেলো। তোমার চাঁদবদন দেখে একবার সুবহানআল্লাহ বলি!

রাবেয়া কাঠের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

হুজুর রাবেয়ার কাছে আসেন, তার হাত ধরে বলেন— মাশাল্লাহ, কী নরম তোমার হাত। বোরকা খোলো, হুজুরের কাছে পর্দা করা জরুরি কিছু না। তিনি রাবেয়ার কাঁধে হাত রাখেন। সেই হাত ধীরে ধীরে তার বুকের কাছে নেমে আসে!

রাবেয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে, হুজুর শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরেন। জোর করে রাবেয়ার মুখের কালো নেকাব খুলে দিয়েই তিনি চিৎকার করে ওঠেন! শম্পা তুই?

ছোটগল্প : কালোসালু
[] কালের লিখন
গল্পগ্রন্থ: নক্ষত্রের নাকফুল (প্রকাশিতব্য)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *