বাঙ্গালী হিন্দুর এইরকম ভয়ঙ্কর পতন, পরাজয় ও পলায়ন প্রারম্ভ হয় যা আজও অব্যাহত ও নির্বীর্যতা গ্রাস করে সমগ্র সমাজকে?

Uncategorized
শত সহস্র বজ্রের প্রচন্ডতা, অতলান্ত স্থৈর্য ও মহাসমুদ্রসম অপার ধীশক্তিকে যদি একত্রে অনুভব করার প্রচেষ্টা করা যায় ক্ষণিকের তরে, তবেই হয়তো সেই ব্যক্তি – স্বামী বিবেকানন্দকে অনুভবের পথলাভ করা সম্ভব। একান্ত ব্যক্তিগতভাবে, দার্শনিক বিবেকানন্দের চেয়ে বঙ্গের সশস্ত্র বৈপ্লবিক যজ্ঞের ঋত্বিক স্বামী বিবেকানন্দ চিরকালই আকর্ষণ করেছে, করবেও আমৃত্যু। ১৮৬০-এর দশকের শেষার্ধে প্রারম্ভ হয়েছিল যে জাগরণ, আত্মসচেতনতার নিদ্রাভঙ্গ/indelible cognisance তাই প্রকাশিত হয়েছিল Masculine Hinduism রূপে। ধর্ম ও মাতৃভূমি ও তার চিন্তন যে শুধুমাত্র দার্শনিকের লেখনীতেই সসীম বা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, একটি যে বাস্তবিক প্রকাশও থাকে তা এর পূর্বে এত নিপুণতা সহকারে অনুভব করা যায়নি। কিন্তু সেই প্রচন্ডতাও যখন ক্রমশঃ স্তিমিত হয়ে সাংবিধানিক আবরণে পর্যবসিত হতে যাচ্ছে: এবং তা উচিৎ কিনা এ চিন্তাও যখন দৃষ্ট হচ্ছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় উদ্দীপ্ত বাঙ্গালীর ধমনীতে – সেই সন্ধিক্ষণেই আবির্ভাব এই বজ্রভীষণ ব্যক্তিত্বের।
আমেরিকা থেকে কলম্বো থেকে আলমোড়া, কলকাতা অবশ্যই – বয়ে গেল যে মেঘমন্দ্র কন্ঠস্বরের ঝড় – যাঁর প্রেরিত দিশায় মাতৃভূমি হয়ে উঠল ঈশ্বরবৎ ও তাঁর শৃঙ্খলমোচনই ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’ – ধর্মশাস্ত্রের মহত্তম উপলব্ধির এই সুধা আকন্ঠ পাঠ করলো তৎকালীন বঙ্গীয় হিন্দু তরুণ ও যুবসমাজ, ক্রমশ অবশিষ্ট ভারতবর্ষের যৌবন। ১৯০১ সালে তাঁর সাথে ঢাকায় সাক্ষ্যাৎকালে অষ্টাদশ বর্ষীয় তরুণ হেমচন্দ্র যখন স্বামীর কাছ থেকে ধর্মোপদেশ ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন সেই আগ্নেয় স্পর্শ তাঁর ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্নার ভিত নড়িয়ে তাঁকে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে: যা সৃষ্টি করে বজ্রভীষণ প্রতিজ্ঞা ও বজ্রের ঝলক দেখা যায় মুক্তিসঙ্ঘ ও বৈপ্লবিক বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের প্রভা ও প্রত্যেক প্রত্যাঘাতে।  অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, আত্মোন্নতির দধীচিরা যাঁরা পাড়ে নৌকা পুড়িয়ে আগুনের নদী অতিক্রম করার স্পর্ধা প্রকাশ করেছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই প্রবাদপ্রতিম ডঃ বিনয় সরকারের ভাষায়, ‘বিবেকানন্দের বাচ্চা’। 
এই ব্যক্তিও ‘বিবেকানন্দের বাচ্চা’ – আজ এই সময়ে অচঞ্চলচিত্তে বীক্ষণে ব্রতী হলে একটি চিন্তাই অনুভূত হয় – তাঁর অর্থাৎ মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্ম হয়েছিল সশস্ত্র বিপ্লব ও ভারতের মুক্তির স্বার্থেই। বিবাহিত হয়েও তিনি ব্রহ্মচারী, বিবেকানন্দ দ্বারা বর্ণিত তাঁর  উপাস্য উমানাথ, সর্বত্যাগী শঙ্কর; তাঁর বিবাহ, ধন ও জীবন ইন্দ্রিয়সুখের-নিজের ব্যক্তিগত সুখের জন্য ছিল না কখনও ; জন্ম থেকেই তিনি  ‘মায়ের’ জন্য বলিপ্রদত্ত। যা বোঝা যায় মাস্টারদার জীবনের ধ্যেয়, সংগ্রামী সাথীদের সাথে বার্তালাপ, ব্রিটিশকে পরাস্ত করতে নিত্য newer strategies, এক নয়া দিকনির্দেশ guerilla struggle – এর।
তাঁর সহযোগিনী শ্রীমতী কুন্দপ্রভা সেনগুপ্তের স্মৃতিচারণ ‘কারাস্মৃতি’ অনুসারে –  “কিছুদূর গিয়ে এক মন্দিরের কাছে দু’জনে পৌঁছলাম। দরজা খোলাই ছিল। মাস্টার ও আমি ভেতরে ঢুকলাম। তারপর সে টর্চ জ্বালাল। দেখলাম ভীষণা এক কালী মূর্তি। মাস্টার একহাত লম্বা একখানা ডেগার বার করে আমার হাতে দিয়ে বলল, মায়ের সামনে বুকের রক্ত দিয়ে পূজো কর। ওখানে বেলপাতা আছে। আমি বুকের মাঝখানের চামড়া টেনে ধরে একটুখানি কাটার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ফোঁটা রক্ত বের হলো। তা বেলপাতায় করে মাস্টারের কাছে নিয়ে গেলাম, সে বেশ স্পষ্ট করে বলল-মায়ের চরণে দিয়ে বল জীবনে বিশ্বাসঘাতকতা করব না। আমি অসংকোচে মায়ের চরণে রক্ত আর মাথা রেখে এ প্রতিজ্ঞা করলাম।”….. সত্যানন্দ কি পুনরায় দীক্ষিত করলেন শান্তিতে? 
জীবদ্দশায় মাস্টারদা ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আতঙ্ক: অজস্র অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত তাঁর নিঃস্পন্দ দেহকে ১২ই জানুয়ারি, ১৯৩৪ যখন ফাঁসিকাষ্ঠে হত্যা করে সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত করা হল তখনও কি ব্রিটিশ আতঙ্কিত ছিল এই চিন্তায় যে সমুদ্রের তলদেশ থেকেও এই বিবেকানন্দের বাচ্চার পুনরাবির্ভাব হতে পারে? ব্রিটিশ কি বঙ্গভূমিতে ধর্মাশ্রিত এই শৌর্যের হোমাগ্নিকেই ভয় করেছিল একমাত্র? 
এই প্রশ্নের উত্তর কি দিতে পারে বর্তমান যুব প্রজন্ম যাঁরা 
পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরামুখাপেক্ষা, দাসসুলভ দুর্বলতা, অনৈতিকতার ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতায় নিমজ্জিত? যাঁরা শুধুমাত্র সমালোচনায় শ্রেষ্ঠ ও দৃষ্টান্তস্থাপনে নিকৃষ্ট তাঁরা কি প্রকারে এই লজ্জাকর কাপুরুষতাসহায়ে প্রকৃত বীরভোগ্যা স্বাধীনতা লাভ করবে? এই চিন্তা কি জ্বলে উঠবে যে স্বামী বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণের ও মাস্টারদা সূর্য সেনের দেহান্তের মাত্র ৫০ ও ২০ বৎসরের মধ্যে (যথাক্রমে) কি প্রকারে তাঁদের গুণমুগ্ধ বাঙ্গালী হিন্দুর এইরকম ভয়ঙ্কর পতন, পরাজয় ও পলায়ন প্রারম্ভ হয় যা আজও অব্যাহত ও নির্বীর্যতা গ্রাস করে সমগ্র সমাজকে? কি করে অনৈতিকতা, নির্লজ্জতা, লালসা ও দাসত্ব হয়ে ওঠে একমাত্র পাথেয়? 

শুধুমাত্র লেখনী নয় – মহাপুরুষদের প্রতি প্রকৃত অর্থে শ্রদ্ধাবান হতে হলে বাঙ্গালী হিন্দুকে তার মুলে প্রত্যাবর্তন করতে হবে – এইই তার একমাত্র পথ। তীক্ষ্ণ তরবারি হোক তার গঙ্গাজল, কটিমধ্যে লুক্কায়িত ছোরা হোক তার বীজমন্ত্র, বাঘনখ হোক তার অলঙ্কার।….. ধর্মের শাশ্বত বোধ হোক তার আদিত্যসম আধার।…. 
ওঁম অভীঃ ওঁম অভীঃ ওঁম অভীঃ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *