সত্য এবং সুন্দর – উপাখ্যান

Blog অনুপ্রেরণা উপখ্যান গল্প ভারত সাহিত্য

‘সত্য এবং সুন্দর- এর সুসংগতি সম্বন্ধে অনেক সময় তর্ক হয়। কেউ কেউ স্বেচ্ছাকৃতভাবে সত্যকে প্রকাশ করতে স্বীকৃত হন, তবে কেউ হয়তো বলতে পারেন, যেহেতু সত্য সব সময় সুন্দর নয়, তাই প্রায়ই তা অপ্রিয় এবং ভীতিপ্রদ – তা হলে সত্য এবং সুন্দরকে একসঙ্গে প্রকাশ করা যায় কি করে? তার উত্তরে আমরা বলতে পারি যে, ‘সত্য এবং সুন্দর’-এই দুটি সুসংগত পরিভাষা এবং বিশেষভাবে আমরা বলতে পারি যে, প্রকৃত সত্য, যা হচ্ছে জড়াতীত, তা সর্বদাই সুন্দর । সত্য এতই সুন্দর যে, তা সকলকে আর্কষণ করে, এমন কি সত্যকে পর্যন্ত। সত্য এতই সুন্দর যে, বহু মুনি, ঋষি এবং ভক্ত সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করেছেন। আধুনিক যুগের একজন আদর্শ নেতা মহাত্মা গান্ধী সত্যকে নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর সমস্ত জাবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ তিনি সত্যকে লক্ষ্য করেই সাধন করেছিলেন।

শুধু মহাত্মা গান্ধী কেন? আমাদের সকলেরই সত্যের অনুসন্ধানের প্রতি একটি আকর্ষণ রয়েছে, কারণ সত্য কেবল। পুরই নয়, তা সর্বশক্তিমান সর্বৈশ্বর্যময়, সর্বযশসম্পন্ন, সর্বজ্ঞানসম্পন্ন এবং সর্বতোভাবে বৈরাগ্যপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত, প্রকৃত সত্য সম্বন্ধে মানুষের কোন ধারণাই নেই। শতকরা প্রায় নিরানব্বই জন মানুষই সত্যের নামে অসত্যের অনুগমন করছে। আমরা প্রকৃতপক্ষে সত্যের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট, কিন্তু অনাদিকাল ধরে আমরা সত্যরূপে প্রতিভাত, অসত্যকে ভালবাসতে অভ্যস্ত হয়েছি। তাই বিষয়াসক্ত মানুষের কাছে ‘সত্য’এবং সুন্দর’- এই দুইয়ের মিলন সম্ভব নয় । জড় জাগতিক সত্য এবং সুন্দরের বিশ্লেষণ এইভাবে করা যায়।

এক সময় একজন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এবং বলিষ্ঠদেহী মানুষ যাঁর চরিত্র ছিল অত্যন্ত সন্দেহজনক, তিনি এক অতি সুন্দরী রমণীর প্রতি আসক্ত হন। সেই রমণীটি কেবল সুন্দরীই ছিলেন না , তাঁর চরিত্রও ছিল অত্যন্ত নির্মল এবং তিনি সেই পুরুষের প্রেম নিবেদন মোটেই পছন্দ করেননি। সেই পুরুষটি কিন্তু কামার্ত হয়ে তাঁকে জোর করতে থাকেন, তাই সেই রমণীটি অবশেষে তাঁকে সাতদিন অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেন এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে বলেন। পুরুষটি সম্মত হন এবং অনেক আশা নিয়ে তিনি সেই নির্দিষ্ট সময়ের প্রতীক্ষা করতে শুরু করেন।

সেই সাধ্বী মহিলাটি তখন পরম সত্যের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য এক শিক্ষণীয় পন্থা অবলম্বন করেন। তিনি অত্যন্ত উগ্র রেচক ঔষধ গ্রহণ করেন এবং তার ফলে সাতদিন ধরে ক্রমান্বয়ে মল মূত্র ত্যাগ করতে থাকেন ও বমন করতে থাকেন। সেই মল, মূত্র এবং বমন তিনি একটি পাত্রে সঞ্চয় করে রাখেন। সেই রেচক ঔষধের প্রভাবে তথাকথিত অতি সুন্দরী রমণীটি রুগ্ন ,জীর্ণ ও কঙ্কালসার রূপ ধারণ করেন, এবং তাঁর গায়ের রঙ কালো হয়ে যায় ও তার সুন্দর চক্ষুদ্বয় অক্ষিকোটরের গভীরে প্রবিষ্ট হয়ে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। এইভাবে নির্দিষ্ট সময়ে তিনি সেই প্রেমিক পুরুষটিকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকেন।

সেই পুরুষটি তখন সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে সেখানে এসে, সুন্দর ব্যবহার সহকারে সেই কুৎসিত রমণীটিকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি সেখানে কোন সুন্দরী রমণীকে দেখেছেন কি না, যাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য তিনি সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। সেই পুরুষটি বুঝতেই পারেননি, যে সুন্দরী রমণীর প্রতীক্ষা তিনি করছিলেন, তিনি তাঁরই সম্মুখে দন্ডায়মান। যদিও সেই রমণীটি বার বার তাঁকে তাঁর পরিচিতি দেন, কিন্তু তাঁর করুণ অবস্থার ফলে পুরুষটি তাঁকে চিনতেই পারেননি।

অবশেষে সেই রমণীটি সেই প্রতিপত্তিশালী পুরুষটিকে বলেন যে, তিনি তাঁর সৌন্দর্যের উপাদানগুলি আলাদা করে। একটি পাত্রে সঞ্চয় করে রেখেছেন। তিনি তাঁকে এও বলেন যে, তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর সৌন্দর্যের রস উপভোগ করতে পারেন। যখন সেই বিষয়াসক্ত সৌন্দর্য-পিপাসু মানুষটি সেই সৌন্দর্যের রস দেখতে চান, তখন সেই রমণীটি তাঁকে অত্যন্ত দুর্গন্ধময় মল, মূত্র এবং বমনপূর্ণ পাত্রটি দেখিয়ে দেন। এইভাবে তরল সৌন্দর্যের রহস্য তাঁর কাছে প্রকাশিত হয়। অবশেষে সেই সাধ্বী রমণীর কৃপায় সেই জঘন্য চরিত্র মানুষটি প্রকৃত বাস্তব এবং তার ছায়ার মধ্যে পার্থক্য সম্বন্ধে অবগত হতে সক্ষম হন এবং এইভাবে তিনি প্রকৃতিস্থ হন।

আমরা যারা অনিত্য জড় সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি , তাদের অবস্থাও সেই মানুষটিরই মতো। যে রমণীটি কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর একটি পূর্ণ বিকশিত সুন্দর জড় দেহ ছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন সেই অনিত্য জড় দেহ এবং মনের অতীত। প্রকৃতপক্ষে, তিনি ছিলেন চিৎ , এবং তাঁর রক্ত – মাংসের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তাঁর যে প্রেমিক, তিনিও ছিলেন এক চিৎ স্ফুলিঙ্গ। জড়বাদী ভাবুক এবং সৌন্দর্যবিদেরা কিন্তু আপেক্ষিক সত্যের বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং আকর্ষণের দ্বারা মোহিত হন এবং সেই চিৎ স্ফুলিঙ্গ সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞ থাকেন, যা হচ্ছে যুগপৎ সত্য এবং সুন্দর উভয়ই। এই চিৎ স্ফুলিঙ্গ এত সুন্দর যে, তা যখন তথাকথিত সুন্দর দেহটি ছেড়ে চলে যায়, প্রকৃতপক্ষে যা হচ্ছে মল, মুত্র এবং বমনেরই বিকার মাত্র, তখন সুন্দর অলঙ্কার এবং বসন – ভূষণে সজ্জিত থাকলেও সেই দেহটি কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করতে চায় না।

আমরা সকলেই মিথ্যা, আপেক্ষিক সত্যের পশ্চাদ্ধবন করছি, যা প্রকৃত সৌন্দর্যরহিত। বাস্তব সত্য কিন্তু নিত্য সৌন্দর্যময় – সেই সৌন্দর্য চিরকাল বর্তমান থাকে। সেই চিৎ-ফুলিঙ্গ অবিনশ্বর । রক্ত মাংসের সৌন্দর্য উগ্র রেচক ওষণে প্রভাবে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সত্যের সৌন্দর্য অবিনশ্বর এবং চিরকাল তার পরম সুন্দর “নিয়ে তা বিরাজ করে। দুর্ভাগ্যবশত , জড় শিল্পী এবং ভাবুকেরা সেই চিৎ-ফুলিঙ্গের (আত্মার) সৌন্দর্য সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞ। এই সমস্ত চিৎ- স্ফুলিঙ্গের উৎস যে অগ্নি (ভগবান), সেই সম্বন্ধেও তারা সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞ, এবং সেই অগ্নির সঙ্গে চিৎ স্ফুলিঙ্গের যে সম্পর্ক, যা চিন্ময়লীলার রূপ ধারন করে, সেই সম্বন্ধেও তারা সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞ। পরমেশ্বর ভগবানের কৃপায় যখন সেই সমস্ত লীলা এই জগতে প্রদর্শিত হয়, তখন দেহসর্বস্ব মূর্খ মানুষেরা বিভ্রান্ত হয়ে মনে করে যে, পরম সত্য এবং পরম সুন্দরের সেই সমস্ত লীলাবিলাস পূর্ব বর্ণিত মল, মূত্র এবং বমনেরই বিকার। তাই হতাশ হয়ে তার সত্য এবং সুন্দর কিভাবে একই সঙ্গে বিরাজ করতে পারে।

বিষয়াসক্ত মানুষেরা জানে না যে, পূর্ণ চেতন সত্তা হচ্ছেন এক পরম সুন্দর পুরুষ, যিনি সকলকে আকর্ষণ করেন। তারা জানে না যে, তিনিই হচ্ছেন বাস্তব বস্তু, তিনিই হচ্ছেন সব কিছুর পরম উৎস। অণুসদৃশ্য চিৎ-স্ফুলিঙ্গের পার্থক্য হচ্ছে যে, তিনি সর্ব অবস্থাতেই পূর্ণ পুরুষোত্তম, আর স্ফুলিঙ্গসমূহ সর্ব অবস্থাতেই তাঁর বিভিন্ন অংশ। তাঁরা উভয়ই কিন্তু পরম সত্য, পরম সুন্দর, পরম জ্ঞানময়, পরম শক্তিসম্পন্ন,পরম ঐশ্বর্যমন্ডিত এবং পরম বৈরাগ্যপূর্ণ। শ্রেষ্ঠ জড়বাদী কৰি অথবা ভাবুকের দ্বারা রচিত হলেও, কোন সাহিত্য যদি সেই পরম সত্য এবং সুন্দরকে বর্ণনা না করে, তা হলে তা কেবল আপেক্ষিক সত্যের মল, মুত্র এবং বমনের আধার মাত্র।

হিতোপদেশ: প্রকৃত সত্য হচ্ছে তা-ই, যা পরম সত্যের পরম সৌন্দর্য বর্ণনা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *