বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের হিন্দু মন্দির -২য় পর্ব

Blog ইতিহাস ধর্ম বাংলাদেশ

হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ। ভারত ও নেপালের পরে বাংলাদেশে সর্বাধিক সংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস। দেশভাগ ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেলেও এখনও বাংলাদেশে অনেক প্রাচীন হিন্দু মন্দির রয়ে গিয়েছে। যদিও এগুলির অধিকাংশই বর্তমানে অত্যন্ত ক্ষয়িষ্ণু ও জরাজীর্ণ অবস্থায় ধ্বংসের দিন গুনছে। মুসলিম আধিপত্যের কারণে এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের জমি সংক্রান্ত লোভের কারণে হিন্দু মন্দিরগুলোর অধিকাংশ জমি বেদখল হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা থাকলেও এখনও বাংলাদেশে হিন্দু মন্দির, আশ্রম বা আখড়ার সংখ্যা এক লাখের উপরে।দেখে নিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ১০০টি হিন্দু মন্দিরের ছবির মধ্যে ২০টি ছবির ২য় পর্ব।

কৃতজ্ঞতা: Temples with Atanu

অসাধারণ কিছু দুষ্প্রাপ্য ও বিরল ভিডিও দেখুন এখানে 👇https://www.youtube.com/c/TempleswithAtanu

জোড় বাংলা মন্দির, পাবনা

জোড় বাংলা মন্দির পাবনা জেলার পাবনা সদর উপজেলার দক্ষিন রাঘবপুরের জোড়বাংলা পাড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

জনশ্রুতি অনুসারে, জোড় বাংলা মন্দিরটি ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়াও এটাও প্রচলিত যে, মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, ব্রজমোহন ক্রোড়ী নামক একজন যিনি মুর্শিদাবাদ নবাবের তহশীলদার ছিলেন। তবে মন্দিরটি আবিষ্কারের সময় কোন শিলালিপি পাওয়া না যাওয়ায় এর সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় না।

জোড় বাংলা মন্দিরটি ইট নির্মিত একটি মঞ্চের উপর স্থাপন করা হয়েছে। উপরের পাকা ছাদটি দোচালা প্রকৃতির। মন্দিরটির সামনে তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে যেগুলো ২টি স্তম্ভের সাহায্য নির্মাণ করা হয়েছে। দেয়ালের নকশা ও কারুকার্যের ভিত্তিতে এটি কান্তনগর মন্দির-এর অনুরূপ স্থাপনা। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে মন্দিরটির বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বরদাকান্ত মিত্র রায়চৌধুরীর মঠ, হিজলা, বরিশাল

১৮৯৯ সালে জমিদার বরদাকান্ত মিত্র রায়চৌধুরী এই মঠ নির্মাণ করেন। একই পাতাটনের উপরে পাশাপাশি দুটি সমাধি মন্দির। এর একটি বরদাকান্ত মিত্রের বাবা রামকানাই মিত্র এবং অপরটি তার মায়ের। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে ব্যতিক্রম ও দৃষ্টিনন্দন এই মঠ তৈরিতে সময় লেগেছিল দুই বছর। ভূমি থেকে ৮০ ফুট উঁচুতে এই মঠের চূড়া। যার নির্মাণ শিল্পীদের আনা হয়েছিল ভারত থেকে।

দশ শতাংশ জমির উপর নির্মিত এই মঠের চারিধারে তিন একর জমি রয়েছে। পাশেই রয়েছে জমিদার বাড়ির নাটমন্দির। যেখানে এক সময় সাড়ম্বরে দুর্গাপূজা হতো। কোনো এক সময় মঠেও পূজা-অর্চনা হতো। সময়ের ব্যবধানে তার কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই। ১৯৫১ সালে পার্শ্ববর্তী উপজেলা মুলাদিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভয়াবহ রূপ নিলে ওই বছরই জমিদার বরদাকান্তের বংশধররা দেশান্তরী হন।

মুন্সিগঞ্জের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত পঞ্চরত্ন শিবমন্দির।

রায়গ্রাম জোড় বাংলা মন্দির, নড়াইল

জোড় বাংলা মন্দির নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের একটি প্রাচীন মন্দির ও অন্যতম সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।

ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, মন্দিরটি নির্মাণ করেন মেনাহাতি নামক এক ব্যক্তির ছোটভাই রামশঙ্কর। মেনাহাতি, সীতারাম রাজার অন্যতম একজন সেনাপতি ছিলেন বলে মনে করা হয়।

অন্য সকল জোড় বাংলা মন্দিরের সাথে এর স্থাপত্যশৈলিতে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এটি সীতারাম রাজার সময়কালে তৈরি বলে তার তৈরি মন্দিরগুলোর অনুকরণেই তৈরি করা হয়েছে। মন্দিরটি দোচালা আকৃতির ও ছাদ পাকা করা হয়েছিল।

ভাওয়াল রাজবাড়ির মঠ, গাজীপুর

গাজীপুরের প্রাচীন নিদর্শন গুলোর মধ্যে ভাওয়াল রাজবাড়ী ও শ্মশান ঘাট অন্যতম। রাজবাড়ীটি ৫ একর জায়গার উপর অবস্থিত এবং সাথে একটি দিঘিও আছে। এটিই বাংলাদেশর সবচেয়ে বড় রাজবাড়ী।

রাজবাড়ীর অনেককিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে শ্মশান ঘাটের এই মঠগুলোই টিকে আছে তাও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসপ্রায়। এটি ছিল ভাওয়াল রাজপরিবারের সদস্যদের শবদাহের স্থান। এখানে রাজপরিবারের মৃত সদস্যদের নামে সৌধ নির্মাণ ও নামফলক স্থাপন করা হতো।

শ্মশান চত্বরে একটি শিবমন্দির রয়েছে। এর অবস্হান রাজবাড়ী থেকে কিছুটা দূরে। ১৮৫১ সালে কালী নারায়নের সময়ে ভাওয়াল শ্মশান মঠগুলো নির্মিত হয়। সবচেয়ে বড় মঠটি নির্মিত হয়েছে ভাওয়াল রাজত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মেজকুমার কৃষ্ণ নারায়ন রায়ের উদ্দেশ্যে। এই অসাধারণ স্হাপত্যও আজ ধ্বংসের পথে। চুন সুরকি খসে পরা, দরজা জানালা গুলো ভাঙা, চারপাশে নোংরা পরিবেশ।

কালীগঞ্জের তৈলকুপি গ্রামের শিবমন্দির, ঝিনাইদহ

কালীগঞ্জ উপজেলার তৈলকুপি গ্রামে বেগবতী নদীর তীরে অযত্নে আর অবহেলায় এখনও গাছপালা মাথায় নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজা ভূষণদেবের আমলের ঐতিহাসিক শিব মন্দিরটি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় পাঁচশ বছর আগে সুরী বিঞ্চুদাস হাজরা নলডাঙ্গায় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর প্রায় তিনশ বছর বিঞ্চুদাসের বংশধরেরা এই এলাকা শাসন করেন। ১৮৭০ সালে রাজা ইন্দুভূষণ মারা গেলে তার নাবালক দত্তক পুত্র রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণদেব রায় রাজ্যের দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ভূষণদেব রায় কয়েকটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন যা আজও কালের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বেগবতী নদীর তীরে। এর একটি হচ্ছে তৈলকূপী গ্রামের বেগবতী নদীর শশ্মান ঘাটের শিব মন্দির।

১৯৫৫ সালে এক সরকারি আদেশে অন্যান্য জমিদারির মতো এই জমিদারিও সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং রাজবংশ শেষবারের মতো লোপ পায়। তারপর থেকেই মন্দিরের কোনো সংস্কার হয়নি।

ছয়ঘরিয়া জোড়া শিব মন্দির, সাতক্ষীরা

ছয়ঘরিয়া জোড়া শিব মন্দির বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত। বাংলা ১২২০ সালের পহেলা বৈশাখ ফকিরচাঁদ ঘোষ জোড়া মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

দুটি মন্দিরই বর্গাকৃতির। মন্দিরের দেয়ালের গায়ে বৈচিত্রময় টেরাকোটার নকশা আছে। ফুল, লতা-পাতা, পরী, বাদক, অশ্বারোহী, হস্তীরোহী, দেব-দেবী সহ নানা চিত্রের দেখা মেলে দেয়াল নকশায়। সাতক্ষীরা অঞ্চলে প্রাপ্ত টেরাকোটা ডিজাইন সমুহের মধ্যে ছয়ঘরিয়ার মন্দিরের টেরাকোটার কাজ শ্রেষ্ঠ।

লাখুটিয়া জমিদার বাড়ির দুর্গা মন্দির, বরিশাল

লাখুটিয়া জমিদার বাড়ি বাংলাদেশ এর বরিশাল জেলার বরিশাল সদর উপজেলার লাখুটিয়া গ্রামে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি।

জমিদার বাড়িটি আনুমানিক ১৬০০ কিংবা ১৭০০ সালে জমিদার রাজচন্দ্র রায় নির্মাণ করেন। রাজচন্দ্রের পুত্র পিয়ারীলাল রায় একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত ব্যারিস্টার ও সমাজসেবী ছিলেন। তাঁর দুই পুত্র বিখ্যাত বৈমানিক ইন্দ্রলাল রায় এবং বক্সার পরেশলাল রায়। তবে এই জমিদার বংশের মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রূপচন্দ্র রায়। জমিদার বংশের লোকেরা অনেক জনহিতকর কাজ করে গেছেন। তারা তখনকার সময়ে উল্লেখযোগ্য “রাজচন্দ্র কলেজ” ও “পুষ্পরানী বিদ্যালয়” নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে এখানে তাদের কোনো উত্তরসূরি নেই। এখানে শেষ জমিদার ছিলেন দেবেন রায় চৌধুরী। পরে তিনি ভারতের কলকাতায় স্ব-পরিবারে চলে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

বসবাসের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট্য একটি প্রাসাদ রয়েছে। এছাড়াও একটি মঠ, মন্দির, দিঘী রয়েছে। বর্তমানে প্রাসাদের অনেকাংশ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। ভবনগুলি শ্যাওলা পরে আচ্ছাদিত হয়ে আছে৷

ছোট গোবিন্দ মন্দির, পুঠিয়া, রাজশাহী

ছোট গোবিন্দ মন্দির রাজশাহীর, পুঠিয়া উপজেলার অন্তর্গত একটি প্রাচীন মন্দির।

রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ির বিশাল চত্বরের বেশ কয়েকটি নজরকাড়া প্রাচীন মন্দিরের মধ্যে এটি একটি। চারআনি মন্দির চত্বরের গোপাল মন্দির এবং বড় আহ্নিক মন্দিরের পাশে এর অবস্থান।

মন্দিরটি বর্গাকারে নির্মিত। মন্দিরের একটি মাত্র কক্ষ রয়েছে। মন্দিরের পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে সরু বারান্দা এবং দক্ষিণ দিকে তিনটি এবং পূর্ব দিকে একটি প্রবেশ পথ আছে। পোড়ামাটির ফলক দ্বারা মন্দিরের চারপাশের কর্ণার ও দরজার দুপাশ নান্দনিকভাবে সজ্জিত। এটির উপরে একটি ফিনিয়েল বিশিষ্ট চুড়া আকৃতির ছাদ আছে ও কার্নিশ ধনুকের ন্যায় বাকানো। দেয়ালের ফলক গুলোতেও যুদ্ধের কাহিনী, বিভিন্ন হিন্দু দেব দেবীর চিত্র, সংস্কৃত ভাষায় রচিত পোড়ামাটির ফলক দ্বারা সজ্জিত।

চার আনি মন্দির চত্তরে নির্মিত এই মন্দিরটি ১৮০০ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টীয় শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। চার আনি জমিদার এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।

সতেরো রত্ন জগন্নাথ মন্দির, কুমিল্লা

কুমিল্লা জগন্নাথ মন্দির বা সতেরো রত্ন মন্দির বাংলাদেশের কুমিল্লায় অবস্থিত জগন্নাথের প্রতি উৎসর্গিত একটি হিন্দু মন্দির। খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরটি বাংলার টেরাকোটা স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে। এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি প্রকৃতপক্ষে ত্রিপুরার একটি মন্দিরে স্থাপিত ছিল। পরবর্তীকালে মূর্তিগুলি এই মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। কুমিল্লা জেলার প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে একটি এই জগন্নাথ মন্দির।

রাজমালায় বর্ণিত হয়েছে যে, ইহা কৃষ্ণমাণিক্য কর্তৃক নির্ম্মিত, তিনিই মন্দিরের মধ্যে জগন্নাথদেবকে স্থাপন করেন।

বলভদ্র জগন্নাথ সুভদ্রা সহিত
সপ্তদশ রত্নে রাজা করিল স্থাপিত।
—পৃঃ ২৬৭।

এই মন্দির সম্বন্ধে কৃষ্ণমালা গ্রন্থে এইরূপ লেখা হয়েছেঃ—

এক মঠে সপ্তদশ মঠের গঠন
সপ্তদশ রত্ন নাম হৈল সে কারণ॥
—৯ম খণ্ড, ২৬৭ পৃঃ।

অষ্টকোণাকৃতির এই মন্দিরটি সতের রত্ন বিশিষ্ট হলেও বর্তমানে এর অধিকাংশ রত্ন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। মন্দিরের ২য় এবং ৩য় তলায় আটটি করে সর্বমোট সতেরটি রত্ন ছিল। মন্দিরের প্রবেশ পথগুলাতে খিলান আকৃতির কারুকাজ লক্ষ করা যায়। মন্দিরটিকে ফুল, লতা-পাতা, ঘণ্টা ও জ্যামিতিক নকশায় সাজানো হয়েছে।

লোহাগড় মঠ, চাঁদপুর

লোহাগড় মঠ হল বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় অবস্থিত একমাত্র মঠ। প্রায় চার থেকে সাত শতাব্দী পুরাতন প্রাচীন এই মঠ চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার লোহাগড় গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাশে অবস্থিত। যা লোহাগড় জমিদার বাড়ির জমিদাররা তৈরি করেছিলেন।

লোহাগড় জমিদার বাড়ির দুইজন জমিদার লৌহ এবং গহড় নামানুসারে এলাকাটির নাম রাখা হয় লোহাগড়। জমিদারদের নামানুসারে গ্রামের সাথে মিল রেখেই তাদের স্থাপত্যশৈলিরও নাম রাখা হয় লোহাগড় মঠ।

এখানে পাশাপাশি পাঁচটি মঠ ছিল তবে বর্তমানে এখানে মাত্র তিনটি মঠ অবশিষ্ট রয়েছে। বর্তমানে টিকে থাকা তিনটি মঠ ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতার। সবচেয়ে লম্বা মঠটি সবচেয়ে সুন্দর যেটির উপরিভাগে নিম্নভাগের চেয়ে অনেক বেশি নকশার কাজ রয়েছে।

অন্নপূর্ণা মন্দির, সাতক্ষীরা

অন্নপূর্ণা মন্দির বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলায় অবস্থিত।

জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী এই মন্দির নির্মাণ করেন। নান্দনিকতার সৌন্দর্য্যের দিক থেকে অন্নপূর্ণা মন্দির অন্য মন্দিরগুলো থেকে আলাদা। মন্দিরটি ৪৫ ফুট উঁচু। ভূমি থেকে সরু হতে হতে মন্দিরের চূড়া গম্বুজাকৃতির রূপ নিয়েছে। মন্দিরের গায়ে বিভিন্ন টেরাকোটার নকশাওয়ালা ইট ব্যবহার করা হয়েছে।

১৭৯৭ সালে জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী স্থায়ীভাবে সাতক্ষীরায় বসবাস শুরু করেন। তিনি পূজা অর্চনার নিমিত্ত এই মন্দির নির্মাণ করেন।

রানী রাসমনির দোলমন্দির, নড়াইল

১৮’শ সালের গোড়ার দিকে যশোর জেলার একটি পরগনার নাম ছিল মকিমপুর। পরগনাটি শাসন করতেন রানী রাসমনি। জমিদারের শাসনকাজ পরিচালনার জন্য কালিয়া উপজেলার মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে আঠারোবাকি নদীর পাড়ে নড়াগাতিতে ১৮১২ সালে রানী রাসমনি কাছারি বাড়ির ভবন ও একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

দুই শতাধিক বছর আগে নির্মিত রানী রাসমনির দোলমন্দিরটি অযত্ন ও অবহেলায় এখন ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়েছে।

শালনগর চাকলানবিশ পরিবারের জোড়বাংলা মন্দির, নড়াইল

লর্ড কর্ণওয়ালিসের আমলে যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, তখন চাকলানবীশ বাবুদের বাড়ী দালান কোঠায় ভরিয়া ওঠে। তখন বাড়ীতে দূর্গাপূজা হত ১১ খানা। পূজা মণ্ডপের ধ্বংসাবশেষ এখানও বিদ্যমান। বাড়ীতে রথযাত্রা উপলক্ষে বিরাট মেলা বসত। জোড়বাংলা মন্দির ছিল, শিব মন্দির ছিল তিনটি। এইগুলি এখন ধ্বংস প্রায়।

জোড়বাংলা মন্দিরে গোবিন্দদেব বিগ্রহ ছিল। মন্দিরটি এখনও বিদ্যমান। মন্দিরটি সম্ভবত আড়াইশত বৎসর পুর্বে নির্মিত। মন্দিরের খিলান ছাদ ভগ্নপ্রায় অবস্থায় আছে। মন্দিরের দেয়াল পাতলা টালির ন্যায় ইটের তৈরি। দেয়ালে পোড়ামাটির নানা রকম নকশা আঁকা রয়েছে।

শ্যামপুরের শিবমন্দির, মেহেরপুর

মেহেরপুর জেলার শ্যামপুর গ্রামে অবস্থিত মন্দিরটি অনেকের কাছে শ্যামপুর মঠ নামেও পরিচিত।

পূর্ব্বে মেহেরপুর জেলা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অন্তর্গত ছিল। অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার মন্দিরের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তখন মেহেরপুরে অনেকগুলি মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। অনুমিত হয়, শ্যামপুরের এই শিবমন্দির সেই সময়েই নির্ম্মিত হয়েছিল।

উত্তরমুখী মন্দিরটি প্রায় তিন ফুট উঁচু ভিত্তিবেদীর উপরে প্রতিষ্ঠিত। মন্দিরের সামনে একটি বারান্দার ভগ্নাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। বর্গাকার মন্দিরটিতে একটি প্রবেশপথ রয়েছে। প্রবেশপথটি অর্ধবৃত্তাকার খিলান বিশিষ্ট।

মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে প্রচুর ভগ্ন মৃৎপাত্র এবং উঁচু ঢিপি দেখা যায়। এ থেকে অনুমান করা যায়, প্রাচীনকালে শ্যামপুর মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে একটি সমৃদ্ধ জনবসতি ছিল।

হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির, সিরাজগঞ্জ

হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের একটি প্রাচীন মন্দির ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এটি উপজেলার হাটিকুমরুল গ্রামে অবস্থিত বলে একে হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির নামেও ডাকা হয়। তবে স্থানীয়ভাবে এটি দোলমঞ্চ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে আবিষ্কৃত নবরত্ন মন্দিরসমূহের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়।

নবরত্ন মন্দিরটি আবিষ্কারের সময় এখানে কোন শিলালিপির অস্তিত্ব ছিল না বলে এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি অনুসারে, মন্দিরটি ১৬৬৪ সালের দিকে রামনাথ ভাদুরী নামে স্থানীয় এক জমিদার নির্মাণ করেছিলেন।

কিংবদন্তী অনুসারে, রামনাথ ভাদুরী দিনাজপুরের তৎকালীন রাজা প্রাণনাথের বন্ধু ছিলেন। ভাদুরী তার বন্ধুকে তার রাজ্যের রাজস্ব পরিশোধে একবার সাহায্য করেছিলেন। তারই ফলস্বরূপ প্রাণনাথ দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দিরের আদলে সিরাজগঞ্জে এই মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন।

নবরত্ন মন্দিরটি তিনতলাবিশিষ্ট ও এর দেয়ালে প্রচুর পোড়ামাটির নকশা করা রয়েছে। একটি মঞ্চের উপর স্থাপিত মন্দিরটির আয়তন ১৫ বর্গমিটার এর উপর। যে স্তম্ভগুলোর মাধ্যমে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে তার প্রতিটি স্তম্ভের দৈর্ঘ্য ১৫.৪ মিটার ও প্রস্থ ১৩.২৫ মিটার। নবরত্ন নামটি এসেছে মন্দিরের উপর বসানো নয়টি চূড়া থেকে যেগুলো বর্তমানে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

সাত মঠ বা সাত মন্দির বাড়ি, ছাগলনাইয়া, ফেনী

সাত মঠ ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার একটি প্রাচীন মঠ। ছাগলনাইয়ার হিন্দু জমিদার বিনোদ বিহারির বাড়িটি আট একর জায়গাজুড়ে নির্মিত।

সাতমঠের একটির মাথা ভেঙে গেছে। তাই দূর থেকে ছয়টির মাথা দেখা যায়। এগুলো মূলত চিতা মন্দির। এজন্য বিনোদ বিহারির বাড়িটির নাম সাত মন্দির বাড়ি বা রাজবাড়ি বা সাত মঠ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।

এক সঙ্গে সাতটি মঠ ফেনীর ছাগলনাইয়া ব্যাতিত বাংলাদেশের অন্য কোথাও আর দেখা যায় না। প্রতিটি মন্দিরের গায়ে অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ করা আছে। প্রতিটি মন্দিরের চূড়া একটি অন্যটির থেকে ভিন্ন! সাতটা মঠ কিন্তু একসারিতে নয়, দুটো সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। এক সারিতে তিনটি, অন্য সারিতে চারটি। এভাবে একটা সমকোণ তৈরি করেছে।

জানা যায়, ১৯৪৮ সালের দিকে জমিদার বিনোদ বিহারি তার সমস্ত সম্পদ ফেলে কলকাতা চলে যান। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা এখানে বসবাস করেন। এটি ফেনী জেলার প্রাচীন একটি মন্দির বা মঠ।

ইটাকুমারী জমিদার বাড়ির ঠাকুরদালান, রংপুর

ইটাকুমারী জমিদার বাড়ি বাংলাদেশ এর রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলায় অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি।

ইটাকুমারী এলাকাটি উন্নত শিক্ষা ও সংস্কৃতিময় এলাকা ছিল। তাই এটিকে অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় নবদ্বীপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ইটাকুমারীর জমিদার ছিলেন রাজা রঘুনাথ চন্দ্র রায়। তিনি এই জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। তার ছেলে শিবচন্দ্র রায় এই জমিদার বাড়ি থেকেই রংপুরের কৃষক প্রজা বিদ্রোহ পরিচালনা করে কৃষক প্রজাদের রক্ষা করেছিলেন। তার সাথে একই উপজেলার মন্থনা জমিদার বাড়ির জমিদার দেবী চৌধুরানীও উক্ত কৃষক প্রজা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তারা উভয়ই ব্রিটিশ সরকারের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন।

শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বাতিঘর হিসেবে ইটাকুমারীর খ্যাতি গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখানে রাজ শিবচন্দ্রের নামে একটি কলেজ রয়েছে। এছাড়াও জমিদার বাড়ি, মন্দির, বিশালাকার পুকুর ও অন্যান্য প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন রয়েছে।

হরিণমারি শিব মন্দির, ঠাকুরগাঁও

ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারী হাটের উপর শিবমন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি আনুমানিক চারশ বছরের প্রাচীন। মন্দিরের ছাদ চারচালা পদ্ধতিতে নির্মিত।

মন্দিরটির বর্তমান উচ্চতা প্রায় ত্রিশ ফুট। মন্দিরটি বেশ খানিকটা মাটি বসে গেছে। দক্ষিণ দিকে একটি দরজা আছে। দরজায় পোড়ামাটির ফলকে লতাপাতার নকশার সাথে বিভিন্ন মূর্তির প্রতিকৃতি ছিল। বর্তমানে সেগুলো ভেঙ্গে গেছে। মন্দিরের পূর্বদিকে বেশ বড় একটি পুকুর আছে।

চন্দ্রনাথ মন্দির, সীতাকুন্ড, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশের সীতাকুন্ডের নিকটে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপরে অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির অন্যতম বিখ্যাত শক্তিপীঠ। সীতাকুণ্ড অপরূপ প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের লীলাভূমি। এখানের সর্বোচ্চ পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির। সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ মন্দির তীর্থযাত্রীদের জন্য এক পবিত্র স্থান। এখানে সতী দেবীর দক্ষিণ হস্তার্ধ পতিত হয়েছিল।

এই মন্দিরে প্রতিবছর শিবরাত্রি তথা শিবর্তুদশী তিথিতে বিশেষ পূজা হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডে বিশাল শিবর্তুদশী মেলা হয়। এই মেলায় বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য সাধু এবং নারী-পুরুষ যোগদান করেন। এই মেলায় ১০-২০ লক্ষাধিক তীর্থযাত্রীর আগমণ ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *